এসো এসো ভ্রাতৃগণ! সরল অন্তরে

        সরল প্রীতির ভরে

        সবে মিলি পরস্পরে

আলিঙ্গন করি আজ বহুদিন পরে।

এসেছে জাতীয় মেলা ভারতভূষণ,

        ভারত সমাজে তবে

        হৃদয় খুলিয়া সবে

এসো এসো এসো করি প্রিয়সম্ভাষণ।

দূর করো আত্মভেদ বিপদ-অঙ্কুর,

        দূর করো মলিনতা

        বিলাসিতা অলসতা,

হীনতা ক্ষীণতা দোষ করো সবে দূর।

ভীরুতা বঙ্গীয়জন-কলঙ্ক-প্রধান —

        সে-কলঙ্ক দূর করো,

        সাহসিক তেজ ধরো,

স্বকার্যকুশল হও হয়ে একতান।

হল না কিছুই করা যা করিতে এলে —

        এই দেখো হিন্দুমেলা,

        তবে কেন কর হেলা?

কী হবে কী হবে আর তুচ্ছ খেলা খেলে?

সাগরের স্রোতসম যাইছে সময়।

        তুচ্ছ কাজে কেন রও,

        স্বদেশহিতৈষী হও —

স্বদেশের জনগণে দাও রে অভয়।

নাহি আর জননীর পূর্বসুতগণ —

        হরিশ্চন্দ্র যুধিষ্ঠির

        ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ বীর,

অনন্তজলধিতলে হয়েছে মগন।

 

নাহি সেই রাম আদি সম্রাট প্রাচীন,

        বিক্রম-আদিত্যরাজ,

        কালিদাস কবিরাজ,

পরাশর পারাশর পণ্ডিত প্রবীণ।

সকলেই জল বায়ু তেজ মৃত্তিকায়

        মিশাইয়া নিজদেহ

        অনন্ত ব্রহ্মের গেহ

পশেছে কীর্তিরে শুধু রাখিয়ে ধরায়।

আদরে সে প্রিয় সখী আচ্ছাদি গগনে

        সে লোকবিশ্রুত নাম

        সে বিশ্ববিজয়ী ধাম

নির্ঘোষে ঘুষিছে সদা অখিল ভুবনে।

যবনের রাজ্যকালে কীর্তির আধার

        চিতোর-নগর নাম

        অতুলবীরত্বধাম,

কেমন ছিল রে মনে ভাবো একবার।

এইরূপ কত শত নগর প্রাচীন

        সুকীর্তি-তপন-করে

        ভারত উজ্জ্বল ক’রে

অনন্ত কালের গর্ভে হয়েছে বিলীন।

নাহি সেই ভারতের একতা-বিভব,

        পাষাণ বাঁধিয়া গলে

        সকলের পদতলে

লুটাইছে আর্যগণ হইয়া নীরব।

গেল, হায়, সব সুখ অভাগী মাতার —

        ছিল যত মনোআশা

        নিল কাল সর্বনাশা,

প্রসন্ন বদন হল বিষণ্ণ তাঁহার।

কী আর হইবে মাতা খুলিয়া বদন।

        দীপ্তভানু অস্ত গেল,

        এবে কালরাত্রি এল,বসনে আবরি মুখ কাঁদো সর্বক্ষণ।

বিশাল অপার সিন্ধু, গভীর নিস্বনে

        যেখানে যেখানে যাও

        কাঁদিতে কাঁদিতে গাও —

ডুবিল ভারতরবি অনন্ত জীবনে।

সুবিখ্যাত গৌড় যেই বঙ্গের রতন —

        তার কীর্তিপ্রতিভায়

        খ্যাতাপন্ন এ ধরায়

হয়েছিল একদিন বঙ্গবাসিগণ।

গেল সে বঙ্গের জ্যোতিঃ কিছুকাল পরে —

        কোনো চিহ্ন নাহি তার,

        পরিয়া হীনতাহার,

ডুবিয়াছে এবে বঙ্গ কলঙ্কসাগরে।

হিন্দুজনভ্রাতৃগণ! করি হে বিনয় —

        একতা উৎসাহ ধরো,

        জাতীয় উন্নতি করো,

ঘুষুক ভুবনে সবে ভারতের জয়।

জগদীশ! তুমি, নাথ, নিত্য-নিরাময়

        করো কৃপা বিতরণ,

        অধিবাসিজনগণ,

করুক উন্নতি — হোক্‌ ভারতের জয়!

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

artpoet

Share
Published by
artpoet

Recent Posts

পথিকের বন্ধু

মহকুমার টাউন থেকে বেরুলাম যখন, তখনই বেলা যায় যায়।কলকাতা থেকে আসছিলাম বরিশাল এক্সপ্রেসে। বারাসাত স্টেশনে…

1 week ago

নুটি মন্তর

হাবু— নাপিতের ছেলে, সুতরাং রীতিমতো তার বুদ্ধি।পায়রাগাছির গুণিন রোজা (ওঝা) এ অঞ্চলে প্রসিদ্ধ, সে নাকি…

1 week ago

তিরোলের বালা

মার্টিন কোম্পানির ছোটো লাইন।গাড়ি ছাড়বার সময় উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে, এখনও ছাড়বার ঘণ্টা পড়েনি। এ নিয়ে…

1 week ago

তারানাথ তান্ত্রিকের দ্বিতীয় গল্প

তারানাথ তান্ত্রিকের প্রথম গল্প আপনারা শুনিয়াছেন কিছুদিন আগে, হয়তো অনেকেই বিশ্বাস করেন নাই। সুতরাং তাহার…

1 week ago

তারানাথ তান্ত্রিকের গল্প

সন্ধ্যা হইবার দেরি নাই। রাস্তায় পুরোনো বইয়ের দোকানে বই দেখিয়া বেড়াইতেছি, এমন সময়ে আমার এক…

1 week ago

টান

ভূত আছে কি নেই এ তর্ক বহুদিনের। ভগবানের অস্তিত্ব নিয়েও এ ধরনের তর্ক আদিম যুগ…

4 weeks ago