এক দিন, অপরাহ্ণ সময়ে, ইংলণ্ডের অধীশ্বর তৃতীয় জর্জ একাকী পদব্রজে ভ্রমণ করিতেছিলেন। সেই সময়ে, দুইটী দীন বালক সহসা তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইল। তাহারা তাঁহাকে রাজ্যেশ্বর বলিয়া জানিত না, সামান্য ধনবান্‌ মনুষ্য জ্ঞানে, তাঁহার সম্মুখে জানু পাতিয়া উপবিষ্ট ও কৃতাঞ্জলি হইয়া, বিষণ্ণ বদনে কাতর বচনে কহিল, মহাশয়। আমাদের অত্যন্ত ক্ষুধাবোধ হইয়াছে, সমস্ত দিন আহার পাই নাই, অনুগ্রহ করিয়া আমাদিগকে কিছু দিন। এই বলিতে বলিতে, তাহাদের গণ্ডস্থল বাহিয়া অশ্রুধারা পতিত হইতে লাগিল। কণ্ঠরোধ হওয়াতে, তাহারা আর অধিক বলিতে পারিল না।

 এই ব্যাপার দর্শনে জর্জের অন্তঃকরণে করুণাসঞ্চার হইল। তখন তিনি, তাহাদের হস্ত ধারণ পূর্ব্বক ভূমি হইতে উঠাইলেন, এবং আশ্বাস প্রদান পূর্ব্বক, তাহাদের অবস্থার বিষয়ে, সবিশেষ সমস্ত বর্ণন করিবার নিমিত্ত, কহিলেন। এইরূপে আশ্বাসিত হইয়া, তাহারা কহিল, মহাশয়। আমরা অত্যন্ত দীন, কিছু দিন হইল, আমাদের জননী পীড়িত হইয়াছিলেন, পথ্য ও ঔষধ না পাইয়া, আজ তিন দিন হইল, প্রাণ ত্যাগ করিয়াছেন, তিনি মৃত হইয়া পতিত আছেন, অর্থাভাবে এ পর্য্যন্ত তাঁহার অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া হয় নাই। আমাদের পিতা আছেন, তিনিও, অত্যন্ত পীড়িত হইয়া, আমাদের মৃত জননীর পার্শ্বে পড়িয়া আছেন, অর্থাভাবে তাঁহার চিকিৎসা হইতেছে না, যেরূপ অবস্থা, তাহাতে তিনিও ত্বরায় প্রাণ ত্যাগ করিবেন, সন্দেহ নাই। এই বলিতে বলিতে, তাহাদের নয়নযুগল হইতে প্রবল বেগে বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল।

 সেই দীন পরিবারের দুরবস্থার বিবরণ শুনিয়া, ইংলণ্ডেশ্বর শোকার্ত্ত ও দয়ার্দ্র হইলেন, এবং কহিলেন, তোমরা বাটীতে চল, আমি তোমাদের সঙ্গে যাইতেছি। কিয়ৎক্ষণ পরে, তিনি তাহাদের আলয়ে উপস্থিত হইলেন, এবং তাহাদের বর্ণিত বৃত্তান্ত স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়া, অত্যন্ত শোকাকুল হইয়া, অশ্রু বিমোচন করিতে লাগিলেন। তাঁহার সঙ্গে যাহা ছিল, তৎক্ষণাৎ সেই বালকদিগের হস্তে দিলেন, পরে সত্বর স্বীয় প্রাসাদে প্রতিগমন করিয়া রাজমহিষীকে সবিশেষ সমস্ত শ্রবণ করাইলেন এবং অবিলম্বে, সেই বিপদাপন্ন দীন পরিবারের নিমিত্ত, প্রভূত আহার সামগ্রী, শীতবস্ত্র, পরিধেয় বসন প্রভৃতি যাবতীয় আবশ্যক বস্তু পাঠাইলেন, আর তাহাদের পীড়িত পিতার চিকিৎসার নিমিত্ত, এক জন উত্তম ডাক্তার নিযুক্ত করিয়া দিলেন।

 এইরূপ রাজকীয় সাহায্য লাভ করিয়া, সে ব্যক্তি ত্বরায় সুস্থ হইয়া উঠিল। ইংলণ্ডেশ্বর সেই নিরাশ্রয় পরিবারের প্রতি এত সদয় হইয়াছিলেন যে, তাহাদের উপস্থিত বিপদ নিবারণ করিয়াই ক্ষান্ত রহিলেন না, তাহাদের অনায়াসে ভরণ পোষণ নির্ব্বাহের এবং সেই দুই বালকের উত্তমরূপ বিদ্যা শিক্ষায়, বিশিষ্টরূপ ব্যবস্থা করিয়া দিলেন।

artpoet

Share
Published by
artpoet

Recent Posts

রাজসিংহ

প্রথম খণ্ডচিত্রে চরণপ্রথম পরিচ্ছেদ : তসবিরওয়ালীরাজস্থানের পার্‍বত্যপ্রদেশে রূপনগর নামে একটি ক্ষুদ্র রাজ্য ছিল। রাজ্য ক্ষুদ্র…

4 days ago

কৃষ্ণকান্তের উইল

প্রথম পরিচ্ছেদহরিদ্রাগ্রামে এক ঘর বড় জমীদার ছিলেন। জমীদার বাবুর নাম কৃষ্ণকান্ত রায়। কৃষ্ণকান্ত রায় বড়…

4 days ago

রজনী

রজনীপ্রথম খণ্ডরজনীর কথাপ্রথম পরিচ্ছেদতোমাদের সুখদু:খে আমার সুখদু:খ পরিমিত হইতে পারে না। তোমরা আর আমি ভিন্নপ্রকৃতি।…

4 days ago

রাধারাণী

প্রথম পরিচ্ছেদরাধারাণী নামে এক বালিকা মাহেশে রথ দেখিতে গিয়াছিল। বালিকার বয়স একাদশ পরিপূর্ণ হয় নাই।…

4 days ago

চন্দ্রশেখর

প্রথম খণ্ডপাপীয়সীপ্রথম পরিচ্ছেদ : দলনী বেগমসুবে বাঙ্গালা বেহার ও উড়িষ্যার অধিপতি নবাব আলিজা মীরকাসেম খাঁ…

4 days ago

যুগলাঙ্গুরীয়

যুগলাঙ্গুরীয়প্রথম পরিচ্ছেদদুইজনে উদ্যানমধ্যে লতামণ্ডপতলে দাঁড়াইয়াছিলেন। তখন প্রাচীন নগর তাম্রলিপ্তের চরণ ধৌত করিয়া অনন্ত নীল সমুদ্র…

4 days ago