মন্ত্রেসে যে পূত

                        রাখীররাঙা সুতো

                     বাঁধন  দিয়েছিনু হাতে,

                     আজ কিআছে সেটি সাথে।

                বিদায়বেলা এল    মেঘের মতো ব্যেপে,

                গ্রন্থি বেঁধে দিতে  দু হাত গেল কেঁপে,

                সেদিন থেকে থেকে        চক্ষুদুটি ছেপে

                     ভরে যে এল  জলধারা।

                আজকে বসে আছি          পথের এক পাশে,

                আমের ঘন বোলে           বিভোল মধুমাসে

                তুচ্ছ কথাটুকু       কেবল মনে আসে

                     ভ্রমর যেন পথহারা–

                সেই-যে বাম হাতে         একটি সরু রাখী–

                     আধেক রাঙা, সোনা আধা,

                     আজো কি আছে সেটি বাঁধা।

 

                          পথ যে কতখানি

                          কিছুই নাহি জানি,

                     মাঠের গেছে কোন্‌ শেষে

                     চৈত্র-ফসলের দেশে।

                যখন গেলে চলে   তোমার গ্রীবামূলে

                দীর্ঘ বেণী তব      এলিয়ে ছিল খুলে,

                মাল্যখানি গাঁথা    সাঁজের কোন্‌ ফুলে

                     লুটিয়ে পড়েছিল পায়ে।

                একটুখানি তুমি    দাঁড়িয়ে যদি যেতে!

                নতুন ফুলে দেখো  কানন ওঠে মেতে,

                দিতেম ত্বরা করে   নবীন মালা গেঁথে

                     কনকচাঁপা-বনছায়ে।

                মাঠের পথে যেতে  তোমার মালাখানি

                     প’ল কি বেণী হতে খসে

                     আজকে ভাবি তাই বসে।

 

                          নূপুর ছিল ঘরে

                          গিয়েছ পায়ে প’রে–

                     নিয়েছ হেথা হতে তাই,

                     অঙ্গে আর কিছু নাই।

                আকুল কলতানে   শতেক রসনায়

                চরণ ঘেরি তব    কাঁদিছে করুণায়,

                তাহারা হেথাকার     বিরহবেদনায়

                     মুখর করে তব পথ।

                জানি না কী এত যে         তোমার ছিল ত্বরা,

                কিছুতে হল না যে           মাথার ভূষা পরা,

                দিতেম খুঁজে এনে            সিঁথিটি মনোহরা–

                     রহিল মনে মনোরথ।

                হেলায়-বাঁধা সেই  নূপুর-দুটি পায়ে

                     আছে কি পথে গেছে খুলে

                     সে কথা ভাবি তরুমূলে।

 

                          অনেক গীতগান

                          করেছি অবসান

                     অনেক সকালে ও সাঁজে

                     অনেক অবসরে কাজে।

                তাহারি শেষ গান           আধেক লয়ে কানে

                দীর্ঘ পথ দিয়ে      গেছ সুদূর-পানে,

                আধেক-জানা সুরে       আধেক-ভোলা তানে

                     গেয়েছ গুন্‌ গুন্‌ স্বরে।

                কেন না গেলে শুনি          একটি গান আরো–

                সে গান শুধু তব,         সে নহে আর কারো–

                তুমিও গেলে চলে            সময় হল তারো,

                     ফুটল তব পূজাতরে।

                মাঠের কোন্‌খানে  হারালো শেষ সুর

                     যে গান নিয়ে গেল শেষে,

                     ভাবি যে তাই অনিমেষে।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

artpoet

Share
Published by
artpoet

Recent Posts

পথিকের বন্ধু

মহকুমার টাউন থেকে বেরুলাম যখন, তখনই বেলা যায় যায়।কলকাতা থেকে আসছিলাম বরিশাল এক্সপ্রেসে। বারাসাত স্টেশনে…

1 week ago

নুটি মন্তর

হাবু— নাপিতের ছেলে, সুতরাং রীতিমতো তার বুদ্ধি।পায়রাগাছির গুণিন রোজা (ওঝা) এ অঞ্চলে প্রসিদ্ধ, সে নাকি…

1 week ago

তিরোলের বালা

মার্টিন কোম্পানির ছোটো লাইন।গাড়ি ছাড়বার সময় উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে, এখনও ছাড়বার ঘণ্টা পড়েনি। এ নিয়ে…

1 week ago

তারানাথ তান্ত্রিকের দ্বিতীয় গল্প

তারানাথ তান্ত্রিকের প্রথম গল্প আপনারা শুনিয়াছেন কিছুদিন আগে, হয়তো অনেকেই বিশ্বাস করেন নাই। সুতরাং তাহার…

1 week ago

তারানাথ তান্ত্রিকের গল্প

সন্ধ্যা হইবার দেরি নাই। রাস্তায় পুরোনো বইয়ের দোকানে বই দেখিয়া বেড়াইতেছি, এমন সময়ে আমার এক…

1 week ago

টান

ভূত আছে কি নেই এ তর্ক বহুদিনের। ভগবানের অস্তিত্ব নিয়েও এ ধরনের তর্ক আদিম যুগ…

4 weeks ago