বেলা দ্বিপ্রহর।

ক্ষুদ্র শীর্ণ নদীখানি শৈবালে জর্জর

স্থির স্রোতোহীন। অর্ধমগ্ন তরী-‘পরে

মাছরাঙা বসি, তীরে দুটি গোরু চরে

শষ্যহীন মাঠে। শান্তনেত্রে মুখ তুলে

মহিষ রয়েছে জলে ডুবি। নদীকূলে

জনহীন নৌকা বাঁধা। শূন্য ঘাটতলে

রৌদ্রতপ্ত দাঁড়কাক স্নান করে জলে

পাখা ঝটপটি। শ্যামশষ্পতটে তীরে

খঞ্জন দুলায়ে পুচ্ছ নৃত্য করি ফিরে।

চিত্রবর্ণ পতঙ্গম স্বচ্ছ পক্ষভরে

আকাশে ভাসিয়া উড়ে, শৈবালের ‘পরে

ক্ষণে ক্ষণে লভিয়া বিশ্রাম। রাজহাঁস

অদূরে গ্রামের ঘাটে তুলি কলভাষ

শুভ্র পক্ষ ধৌত করে সিক্ত চঞ্চুপুটে।

শুষ্কতৃণগন্ধ বহি ধেয়ে আসে ছুটে

তপ্ত সমীরণ–চলে যায় বহু দূর।

থেকে থেকে ডেকে ওঠে গ্রামের কুকুর

কলহে মাতিয়া। কভু শান্ত হাম্বাস্বর,

কভু শালিখের ডাক, কখনো মর্মর

জীর্ণ অশথের, কভু দূর শূন্য-‘পরে

চিলের সুতীব্র ধ্বনি, কভু বায়ুভরে

আর্ত শব্দ বাঁধা তরণীর–মধ্যাহ্নের

অব্যক্ত করুণ একতান, অরণ্যের

স্নিগ্ধচ্ছায়া, গ্রামের সুষুপ্ত শান্তিরাশি,

মাঝখানে বসে আছি আমি পরবাসী।

প্রবাসবিরহদুঃখ মনে নাহি বাজে;

আমি মিলে গেছি যেন সকলের মাঝে;

ফিরিয়া এসেছি যেন আদি জন্মস্থলে

বহুকাল পরে–ধরণীর বক্ষতলে

পশু পাখি পতঙ্গম সকলের সাথে

ফিরে গেছি যেন কোন্‌ নবীন প্রভাতে

পূর্বজন্মে, জীবনের প্রথম উল্লাসে

আঁকড়িয়া ছিনু যবে আকাশে বাতাসে

জলে স্থলে, মাতৃস্তনে শিশুর মতন–

আদিম আনন্দরস করিয়া শোষণ।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

artpoet

Share
Published by
artpoet

Recent Posts

হাসি

স্টেশনের ওয়েটিং রুমের ভেতরে-বাইরে কোথাও অন্য লোক ছিল না, বেহারাটাকেও ডেকে ডেকে পাওয়া গেল না।…

1 week ago

সোনাকরা যাদুকর

রোহিণী রায় আমাদের গ্রামের জমিদার ছিলেন শুনেছিলাম।আমাদের পাড়ায় তাঁদের মস্ত দোতলা বাড়ি। তিন-চার শরিকে ভাগ…

1 week ago

রহস্য

আমার বন্ধুর মুখে শোনা এ গল্প। বন্ধুটি বর্তমানে কলকাতার কোনো কলেজের প্রফেসার। বেশ বুদ্ধিমান, বিশেষ…

1 week ago

রঙ্কিনীদেবীর খড়গ

জীবনে অনেক জিনিস ঘটে, যাহার কোনো যুক্তিসংগত কারণ খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। তাহাকে আমরা অতিপ্রাকৃত…

1 week ago

মেডেল

কয়েক বছর পূর্বে এ-ঘটনা ঘটেছে, তাই এখন মাঝে মাঝে আমার মনে হয় ব্যাপারটা আগাগোড়া মিথ্যে;…

1 week ago

মেঘমল্লার

দশপারমিতার মন্দিরে সেদিন যখন সাপুড়ের খেলা দেখবার জন্য অনেক মেয়ে-পুরুষ মন্দির প্রাঙ্গণে একত্র হয়েছিল, তারই…

4 weeks ago