ভালোবেসে মন বললে–

“আমার সব রাজত্ব দিলেম তোমাকে।”

অবুঝ ইচ্ছাটা করলে অত্যুক্তি;

দিতে পারবে কেন?

সবটার নাগাল পাব কেমন ক’রে?

ও যে একটা মহাদেশ,

সাত সমুদ্রে বিচ্ছিন্ন।

ওখানে বহুদূর নিয়ে একা বিরাজ করছে

নির্বাক্‌ অনতিক্রমণীয়।

তার মাথা উঠেছে মেঘে-ঢাকা পাহাড়ের চূড়ায়,

তার পা নেমেছে আঁধারে-ঢাকা গহ্বরে।

এ যেন অগম্য গ্রহ এই আমার সত্তা,

বাষ্প-আবরণে ফাঁক পড়েছে কোণে কোণে,

দুরবীনের সন্ধান সেইটুকুতেই।

যাকে বলতে পারি আমার সবটা,

তার নাম দেওয়া হয়নি,

তার নকশা শেষ হবে কবে?

তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ব্যবহারের সম্পর্ক হবে কার?

নামটা রয়েছে যে-পরিচয়টুকু নিয়ে,

টুকরো-জোড়া দেওয়া তার রূপ,

অনাবিষ্কৃতের প্রান্ত থেকে সংগ্রহ-করা।

চারিদিকে ব্যর্থ ও সার্থক কামনার

আলোয় ছায়ায় বিকীর্ণ আকাশ।

সেখান থেকে নানা বেদনার রঙিন ছায়া নামে

চিত্তভূমিতে;

হাওয়ায় লাগে শীত বসন্তের ছোঁওয়া;

সেই অদৃশ্য চঞ্চল লীলা

কার কাছেই বা স্পষ্ট হল?

ভাষার অঞ্জলিতে

কে ধরতে পারে তাকে?

জীবনভূমির এক প্রান্ত দৃঢ় হয়েছে

কর্মবৈচিত্র৻ের বন্ধুরতায়,

আর একপ্রান্তে অচরিতার্থ সাধনা

বাষ্প হয়ে মেঘায়িত হল শূন্যে,

মরীচিকা হয়ে আঁকছে ছবি।

এই ব্যক্তিজগৎ মানবলোকে দেখা দিল

জন্মমৃত্যুর সংকীর্ণ সংগমস্থলে।

তার আলোকহীন প্রদেশে

বৃহৎ অগোচরতায় পুঞ্জিত আছে

আত্মবিস্মৃত শক্তি,

মূল্য পায়নি এমন মহিমা,

অনঙ্কুরিত সফলতার বীজ মাটির তলায়।

সেখানে আছে ভীরুর লজ্জা,

প্রচ্ছন্ন আত্মাবমাননা,

অখ্যাত ইতিহাস,

আছে আত্মাভিমানের

ছদ্মবেশের বহু উপকরণ,–

সেখানে নিগূঢ় নিবিড় কালিমা

অপেক্ষা করছে মৃত্যুর হাতের মার্জনা।

এই অপরিণত অপ্রকাশিত আমি,

এ কার জন্যে, এ কিসের জন্যে?

যা নিয়ে এল কত সূচনা, কত ব্যঞ্জনা,

বহু বেদনায় বাঁধা হতে চলল যার ভাষা,

পৌঁছল না যা বাণীতে,

তার ধ্বংস হবে অকস্মাৎ নিরর্থকতার অতলে,

সইবে না সৃষ্টির এই ছেলেমানুষি।

অপ্রকাশের পর্দা টেনেই কাজ করেন গুণী;

ফুল থাকে কুঁড়ির অবগুণ্ঠনে,

শিল্পী আড়ালে রাখেন অসমাপ্ত শিল্পপ্রয়াসকে;

কিছু কিছু আভাস পাওয়া যায়,

নিষেধ আছে সমস্তটা দেখতে পাওয়ার পথে।

আমাতে তাঁর ধ্যান সম্পূর্ণ হয়নি,

তাই আমাকে বেষ্টন ক’রে এতখানি নিবিড় নিস্তব্ধতা।

তাই আমি অপ্রাপ্য, আমি অচেনা;

অজানার ঘেরের মধ্যে এ সৃষ্টি রয়েছে তাঁরি হাতে,

কারো চোখের সামনে ধরবার সময় আসেনি,

সবাই রইল দূরে,–

যারা বললে, “জানি”, তারা জানল না।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

artpoet

Share
Published by
artpoet

Recent Posts

বিপিনের সংসার

প্রথম পরিচ্ছেদ১বিপিন সকালে উঠিয়া কলাই-চটা পেয়ালাটায় সবে এক পেয়ালা চা লইয়া বসিয়াছে, এমন সময়ে দেখা…

5 hours ago

সীতারাম

সীতারামপ্রথম খণ্ডদিবা-গৃহিণীপ্রথম পরিচ্ছেদপূর্বকালে, পূর্ববাঙ্গালায় ভূষণা নামে এক নগরী ছিল। এখন উহার “ভূষ্য‍ণো |” যখন কলিকাতা…

3 days ago

দেবী চৌধুরাণী

দেবী চৌধুরাণী – ১ম খণ্ডপ্রথম খণ্ডপ্রথম পরিচ্ছেদ“ও পি–ও পিপি–ও প্রফুল্ল–ও পোড়ারমুখী ।”“যাই মা ।”মা ডাকিল–মেয়ে…

3 days ago

আনন্দমঠ

আনন্দমঠ – ১ম খণ্ডপ্রথম পরিচ্ছেদ১১৭৬ সালে গ্রীষ্মকালে এক দিন পদচিহ্ন গ্রামে রৌদ্রের উত্তাপ বড় প্রবল।…

3 days ago

রাজসিংহ

প্রথম খণ্ডচিত্রে চরণপ্রথম পরিচ্ছেদ : তসবিরওয়ালীরাজস্থানের পার্‍বত্যপ্রদেশে রূপনগর নামে একটি ক্ষুদ্র রাজ্য ছিল। রাজ্য ক্ষুদ্র…

1 week ago

কৃষ্ণকান্তের উইল

প্রথম পরিচ্ছেদহরিদ্রাগ্রামে এক ঘর বড় জমীদার ছিলেন। জমীদার বাবুর নাম কৃষ্ণকান্ত রায়। কৃষ্ণকান্ত রায় বড়…

1 week ago