রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভাবনা নিয়ে মরিস কেন খেপে | bhabna niye moris keno khepe

   ভাবনা নিয়ে মরিস কেন খেপে।

          দুঃখ-সুখের লীলা

     ভাবিস এ কি রইবে বক্ষে চেপে

          জগদ্দলন-শিলা।

     চলেছিস রে চলাচলের পথে

     কোন্‌ সারথির উধাও মনোরথে?

     নিমেষতরে যুগে যুগান্তরে

          দিবে না রাশ-ঢিলা।

 

     শিশু হয়ে এলি মায়ের কোলে,

          সেদিন গেল ভেসে।

     যৌবনেরি বিষম দোলার দোলে

          কাটল কেঁদে হেসে।

     রাত্রে যখন হচ্ছিল দীপ জ্বালা

     কোথায় ছিল আজকে দিনের পালা।

     আবার কবে কী সুর বাঁধা হবে

          আজকে পালার শেষে।

 

     চলতে যাদের হবে চিরকালই

          নাইকো তাদের ভার।

     কোথা তাদের রইবে থলি-থালি,

          কোথা বা সংসার।

     দেহযাত্রা মেঘের খেয়া বাওয়া,

     মন তাহাদের ঘূর্ণা-পাকের হাওয়া;

     বেঁকে বেঁকে আকার এঁকে এঁকে

          চলছে নিরাকার।

 

     ওরে পথিক, ধর্‌-না চলার গান,

          বাজা রে একতারা।

     এই খুশিতেই মেতে উঠুক প্রাণ–

          নাইকো কূল-কিনারা।

     পায়ে পায়ে পথের ধারে ধারে

     কান্না-হাসির ফুল ফুটিয়ে যা রে,

     প্রাণ-বসন্তে তুই-যে দখিন হাওয়া

          গৃহ-বাঁধন-হারা!

 

     এই জনমের এই রূপের এই খেলা

          এবার করি শেষ;

     সন্ধ্যা হল, ফুরিয়ে এল বেলা,

          বদল করি বেশ।

     যাবার কালে মুখ ফিরিয়ে পিছু

     কান্না আমার ছড়িয়ে যাব কিছু,

     সামনে সে-ও প্রেমের কাঁদন ভরা

          চির-নিরুদ্দেশ।

 

     বঁধুর চিঠি মধুর হয়ে আছে

          সেই অজানার দেশে।

     প্রাণের ঢেউ সে এমনি করেই নাচে

          এমনি ভালোবেসে।

     সেখানেতে আবার সে কোন্‌ দূরে

     আলোর বাঁশি বাজবে গো এই সুরে

     কোন্‌ মুখেতে সেই অচেনা ফুল

          ফুটবে আবার হেসে।

 

     এইখানে এক শিশির-ভরা প্রাতে

          মেলেছিলেম প্রাণ।

     এইখানে এক বীণা নিয়ে হাতে

          সেধেছিলেম তান।

     এতকালের সে মোর বীণাখানি

     এইখানেতেই ফেলে যাব জানি,

     কিন্তু ওরে হিয়ার মধ্যে ভরি

          নেব যে তার গান।

 

     সে-গান আমি শোনাব যার কাছে

          নূতন আলোর তীরে,

     চিরদিন সে সাথে সাথে আছে

          আমার ভুবন ঘিরে।

     শরতে সে শিউলি-বনের তলে

     ফুলের গন্ধে ঘোমটা টেনে চলে,

     ফাল্গুনে তার বরণমালাখানি

          পরাল মোর শিরে।

 

     পথের বাঁকে হঠাৎ দেয় সে দেখা

          শুধু নিমেষতরে।

     সন্ধ্যা-আলোয় রয় সে বসে একা

          উদাস প্রান্তরে।

     এমনি করেই তার সে আসা-যাওয়া,

     এমনি করেই বেদন-ভরা হাওয়া

     হৃদয়-বনে বইয়ে সে যায় চলে

          মর্মরে মর্মরে।

 

     জোয়ার-ভাঁটার নিত্য চলাচলে

          তার এই আনাগোনা।

     আধেক হাসি আধেক চোখের জলে

          মোদের চেনাশোনা।

     তারে নিয়ে হল না ঘর বাঁধা,

     পথে পথেই নিত্য তারে সাধা

     এমনি করেই আসা-যাওয়ার ডোরে

          প্রেমেরি জাল-বোনা।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

 

artpoet

Share
Published by
artpoet

Recent Posts

বিপিনের সংসার

প্রথম পরিচ্ছেদ১বিপিন সকালে উঠিয়া কলাই-চটা পেয়ালাটায় সবে এক পেয়ালা চা লইয়া বসিয়াছে, এমন সময়ে দেখা…

8 hours ago

সীতারাম

সীতারামপ্রথম খণ্ডদিবা-গৃহিণীপ্রথম পরিচ্ছেদপূর্বকালে, পূর্ববাঙ্গালায় ভূষণা নামে এক নগরী ছিল। এখন উহার “ভূষ্য‍ণো |” যখন কলিকাতা…

3 days ago

দেবী চৌধুরাণী

দেবী চৌধুরাণী – ১ম খণ্ডপ্রথম খণ্ডপ্রথম পরিচ্ছেদ“ও পি–ও পিপি–ও প্রফুল্ল–ও পোড়ারমুখী ।”“যাই মা ।”মা ডাকিল–মেয়ে…

3 days ago

আনন্দমঠ

আনন্দমঠ – ১ম খণ্ডপ্রথম পরিচ্ছেদ১১৭৬ সালে গ্রীষ্মকালে এক দিন পদচিহ্ন গ্রামে রৌদ্রের উত্তাপ বড় প্রবল।…

3 days ago

রাজসিংহ

প্রথম খণ্ডচিত্রে চরণপ্রথম পরিচ্ছেদ : তসবিরওয়ালীরাজস্থানের পার্‍বত্যপ্রদেশে রূপনগর নামে একটি ক্ষুদ্র রাজ্য ছিল। রাজ্য ক্ষুদ্র…

1 week ago

কৃষ্ণকান্তের উইল

প্রথম পরিচ্ছেদহরিদ্রাগ্রামে এক ঘর বড় জমীদার ছিলেন। জমীদার বাবুর নাম কৃষ্ণকান্ত রায়। কৃষ্ণকান্ত রায় বড়…

1 week ago