রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পিলসুজের উপর পিতলের প্রদীপ | pilsujer upor pitoler prodip

পিলসুজের উপর পিতলের প্রদীপ,

খড়কে দিয়ে উসকে দিচ্ছে থেকে থেকে।

হাতির দাঁতের মতো কোমল সাদা

পঙ্খের কাজ-করা মেজে;

তার উপরে খান-দুয়েক মাদুর পাতা।

ছোটো ছেলেরা জড়ো হয়েছি ঘরের কোণে

মিটমিটে আলোয়।

বুড়ো মোহন সর্দার

কলপ-লাগানো চুল বাবরি-করা,

মিশকালো রঙ

চোখ দুটো যেন বেরিয়ে আসছে,

শিথিল হয়েছে মাংস,

হাতের পায়ের হাড়গুলো দীর্ঘ,

কণ্ঠস্বর সরু-মোটায় ভাঙা।

রোমাঞ্চ লাগবার মতো তার পূর্ব-ইতিহাস।

বসেছে আমাদের মাঝখানে,

বলছে রোঘো ডাকাতের কথা।

আমরা সবাই গল্প আঁকড়ে বসে আছি।

দক্ষিণের হাওয়া-লাগা ঝাউডালের মতো

দুলছে মনের ভিতরটা।

খোলা জানলার সামনে দেখা যায় গলি,

একটা হলদে গ্যাসের আলোর খুঁটি

দাঁড়িয়ে আছে একচোখো ভূতের মতো।

পথের বাঁ ধারটাতে জমেছে ছায়া।

গলির মোড়ে সদর রাস্তায়

বেলফুলের মালা হেঁকে গেল মালী।

পাশের বাড়ি থেকে

কুকুর ডেকে উঠল অকারণে।

নটার ঘণ্টা বাজল দেউড়িতে।

অবাক হয়ে শুনছি রোঘোর চরিতকথা।

তত্ত্বরত্নের ছেলের পৈতে,

রোঘো বলে পাঠাল চরের মুখে,

“নমো নমো করে সারলে চলবে না ঠাকুর,

ভেবো না খরচের কথা।”

মোড়লের কাছে পত্র দেয়

পাঁচ হাজার টাকা দাবি ক’রে ব্রাহ্মণের জন্যে।

রাজার খাজনা-বাকির দায়ে

বিধবার বাড়ি যায় বিকিয়ে,

হঠাৎ দেওয়ানজির ঘরে হানা দিয়ে

দেনা শোধ ক’রে দেয় রঘু।

বলে–“অনেক গরিবকে দিয়েছ ফাঁকি,

কিছু হালকা হোক তার বোঝা।”

একদিন তখন মাঝরাত্তির,

ফিরছে রোঘো লুঠের মাল নিয়ে,

নদীতে তার ছিপের নৌকো

অন্ধকারে বটের ছায়ায়।

পথের মধ্যে শোনে–

পাড়ায় বিয়েবাড়িতে কান্নার ধ্বনি,

বর ফিরে চলেছে বচসা করে;

কনের বাপ পা আঁকড়ে ধরেছে বরকর্তার।

এমন সময় পথের ধারে

ঘন বাঁশ বনের ভিতর থেকে

হাঁক উঠল, রে রে রে রে রে রে।

আকাশের তারাগুলো

যেন উঠল থরথরিয়ে।

সবাই জানে রোঘো ডাকাতের

পাঁজর-ফাটানো ডাক।

বরসুদ্ধ পালকি পড়ল পথের মধ্যে;

বেহারা পালাবে কোথায় পায় না ভেবে।

ছুটে বেরিয়ে এল মেয়ের মা

অন্ধকারের মধ্যে উঠল তার কান্না–

“দোহাই বাবা, আমার মেয়ের জাত বাঁচাও।”

রোঘো দাঁড়াল যমদূতের মতো–

পালকি থেকে টেনে বের করলে বরকে,

বরকর্তার গালে মারল একটা প্রচণ্ড চড়,

পড়ল সে মাথা ঘুরে।

ঘরের প্রাঙ্গণে আবার শাঁখ উঠল বেজে,

জাগল হুলুধ্বনি;

দলবল নিয়ে রোঘো দাঁড়াল সভায়,

শিবের বিয়ের রাতে ভূতপ্রেতের দল যেন।

উলঙ্গপ্রায় দেহ সবার, তেলমাখা সর্বাঙ্গে,

মুখে ভুসোর কালি।

বিয়ে হল সারা।

তিন প্রহর রাতে

যাবার সময় কনেকে বললে ডাকাত

“তুমি আমার মা,

দুঃখ যদি পাও কখনো

স্মরণ ক’রো রঘুকে।”

তারপরে এসেছে যুগান্তর।

বিদ্যুতের প্রখর আলোতে

ছেলেরা আজ খবরের কাগজে

পড়ে ডাকাতির খবর।

রূপকথা-শোনা নিভৃত সন্ধ্যেবেলাগুলো

সংসার থেকে গেল চলে,

আমাদের স্মৃতি

আর নিবে-যাওয়া তেলের প্রদীপের সঙ্গে সঙ্গে।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

artpoet

Share
Published by
artpoet

Recent Posts

পথিকের বন্ধু

মহকুমার টাউন থেকে বেরুলাম যখন, তখনই বেলা যায় যায়।কলকাতা থেকে আসছিলাম বরিশাল এক্সপ্রেসে। বারাসাত স্টেশনে…

1 week ago

নুটি মন্তর

হাবু— নাপিতের ছেলে, সুতরাং রীতিমতো তার বুদ্ধি।পায়রাগাছির গুণিন রোজা (ওঝা) এ অঞ্চলে প্রসিদ্ধ, সে নাকি…

1 week ago

তিরোলের বালা

মার্টিন কোম্পানির ছোটো লাইন।গাড়ি ছাড়বার সময় উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে, এখনও ছাড়বার ঘণ্টা পড়েনি। এ নিয়ে…

1 week ago

তারানাথ তান্ত্রিকের দ্বিতীয় গল্প

তারানাথ তান্ত্রিকের প্রথম গল্প আপনারা শুনিয়াছেন কিছুদিন আগে, হয়তো অনেকেই বিশ্বাস করেন নাই। সুতরাং তাহার…

1 week ago

তারানাথ তান্ত্রিকের গল্প

সন্ধ্যা হইবার দেরি নাই। রাস্তায় পুরোনো বইয়ের দোকানে বই দেখিয়া বেড়াইতেছি, এমন সময়ে আমার এক…

1 week ago

টান

ভূত আছে কি নেই এ তর্ক বহুদিনের। ভগবানের অস্তিত্ব নিয়েও এ ধরনের তর্ক আদিম যুগ…

4 weeks ago