সারাদিন ট্রাম-বাস-ফেরিওলাদের ডাক- কুষ্ঠরোগী পথের উপর- হাড়ভাঙা মহিষের গাড়িগুলো-বাজারের রুক্ষ শব্দ-বস্তির চিৎকার। আমার হৃদয়ে যেই শঙ্খমালা কিশোরীটি বাঁধিতে আসিয়াছিল ঘর তাহারে ফিরায়ে দেয় শহরের পথ থেকে পাড়াগাঁর কান্তারের পার-
কবে যে কান্তার ছেড়ে আসিয়াছি নির্বাসিত আমি রাজপুত্রের মতন, কোথায় শিমের গন্ধ? শ্যামা পাখি? কিশোর গেল কি মরে বুকের ভেতর? দুপুর ঘনায়ে ওঠে ভিজা মেঘে- চিল কাঁদে-কই বলো? কই হীরামন?- আমার হৃদয়ে যে গো শঙ্খমালা কিশোরীটি বাঁধিতে আসিয়াছিলো ঘর।
২
আমি যে সংসারে মন দিতে চাই, আমি যে বাঁধিতে চাই পৃথিবীর মানুষের মতো বাসা এক; আমি যে বন্দরে যাই, অন্নের উপায় করি-স্বামী হই পিতা হই আমি; আমি যে ভিড়ের গন্ধ গায়ে মাখি দিনরাত; আঁধারে ঘুমাই, দিনে রৌদ্রে ইতস্তত ঘুরে ফিরি; সংসারের কাজ কথা হাটের ভিতরে আমি অলক্ষ্যে যে পড়িতেছি নামি- এইসব ছেড়ে দিয়ে, হে হৃদয়, চলে যাও অঘ্রাণের পাড়াগাঁর ম্লান তেপান্তরে, সেখানে বটের বুকে দাঁড়কাক বাঁধে বাসা-রাঙা পশমের মতো ফলগুলো ঝরে শুকনো পাতার ‘পরে; সেখানে সন্ধ্যার বক শঙ্খের মতন শাদা পাখনা ভাসায় কামরাঙা-রক্তমেঘে-তিনশো বছর ধরে কোন্ অভিমানী মঠ দেখা যায়- খড়কুটা মুখে নিয়ে শালিখ উড়িয়া যায় কান্তারের ঘাস থেকে প্রান্তরের ঘাসে, এক তারা ফুটিতেই রূপসী প্রেতিনী সেই শঙ্খমালা দেখা দেয় মাঠের বাতাসে। …
৩ যেদিন আমি পৃথিবীর থেকে চলে যাব- হে শঙ্খমালা- অপরিসীম নক্ষত্র তুমি বিছিয়ে রেখো আকাশে, আকাশের অন্ধকার সমতলতা ঘিরে যুগান্তের লুপ্ত মানবীদের মতো কয়েকটি নির্জন নক্ষত্র- এর চেয়ে গভীর জিনিস কী আর থাকতে পারে কী আর থাকতে পারে শঙ্খমালা-
আর আমার বিছানা করে দিয়ো সমতল দেশের শিয়রে
সবুজ ঘাসের ছবির ভিতর ধানসিড়ি নদীর জলের গন্ধের কাছে এই বাংলায়।